বিষাক্ত মদ পান করে গাইবান্ধায় ৭১ জন মারা যাই

বিষাক্ত মদ পান করে গাইবান্ধায় ৭১ জন মারা যাই 

বিষাক্ত মদ পান করে হাজার ১৯৯৮ সালে গাইবান্ধার পয়লা বৈশাখের প্রাক্কালে ৭১ জন মৃত্যুবরণ করেছিলেন। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করে জানতে পারেন যে হতাহত ব্যক্তিরা গাইবান্ধা হোমিও হল এর মালিক রবীন্দ্রনাথ সরকারের কাছ থেকে স্পিরিট কিনে পান করেছিলেন। পুলিশি তদন্তকালে রবীন্দ্রনাথ সরকারকে ভেজাল মদ জোগান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল বগুড়ার পারুল হোমিও  ল্যাবরেটরির তৎকালীন মালিক নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে। 


তবে শেষ পর্যন্ত নূর মোহাম্মদের কিছুই হয়নি। এরপর ২০০০ সালে ২২ জনের বিষাক্ত মদ খেয়ে মৃত্যুবরণ ঘটেছিল বগুড়ায়। আর ওই ঘটনাতেও পারুল হোমিও  ল্যাবরেটরির তৎকালীন মালিক নূর মোহাম্মদের যুক্ত ছিল। পুলিশ তদন্ত করে নূর মোহাম্মদের ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা বের করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেবারও নূর মোহাম্মদের কিছুই হয়নি।


সর্বশেষ নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে আবারো মামলা হয়েছে চলতি সপ্তাহে বগুড়ায় বিষাক্ত মদপানে ১৮ জনের মৃত্যু হবার পর। কিন্তু শত মৃত্যুতেও যখন নূর মোহাম্মদের কিছু হয়নি তখন এখন কি নূর মোহাম্মদের কিছু হবে কি না সেটা নিয়ে এলাকার মানুষ সন্দিহান প্রকাশ করেছেন।


আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা যায় যে নূর মোহাম্মদের নাম গাইবান্ধা ট্র্যাজেডিতেও এসেছিল। ২০০২ সালে বিএনপি'র আমলে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই সময় নূর মোহাম্মদ সব কিছু সামাল দিয়ে ফেলেছিল। মামলার তদন্তকারী সিআইডির  কর্মকর্তা আব্দুর রহমান শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথ সরকার এবং সহযোগী মৃণাল কান্তির বিরুদ্ধে ২৮ জুলাই ২০০২ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে পেরেছিল। রবীন্দ্রনাথ সরকারকে আদালত। ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সরকার তার আগেই দেশত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিলেন ।


চলতি সপ্তাহে আবারও প্রাণহানির ঘটনার পর আলোচনায় বিতর্কিত হোমিও ব্যবসায়ী নুর মহাম্মদ এবং তার অপর দুই ভাই নুরে আলম এবং নুরনবী। এর মধ্যেই নূরনবী পারুল হোমিও ল্যাবরেটরি এবং নুর মুহাম্মদ  ইউনিসন ফার্মা মানে ইউনানি এবং নুর আলম পুনম হোমিও ল্যাবরেটরি চালাচ্ছেন। সম্প্রতি ১৮ জনের প্রাণহানির ঘটনায় তিন ভাইকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ নূর নবীকে গ্রেফতার করতে পারলেও বাকি দুজন এখনো পর্যন্ত লাপাত্তা আছেন।


স্থানীয় সুত্র বলছেন যে প্রভাবশালী নুর মহাম্মদ প্রায় তিন দশক ধরেই দেশের রেকটিফাইড স্পিরিট এর ব্যবসা চালাচ্ছে। প্রভাবশালী নুর মহাম্মদ পারুল হোমিও হল একসময় বগুড়া তথা উত্তরবঙ্গের  ও হোমিও সামগ্রীর একচ্ছত্র জোগানদাতা ছিলেন। নূর মোহাম্মদ একসময় পঞ্চগড়ের মার্শাল ডিস্টিলারিজ থেকে উৎপাদিত রেকটিফাইড স্পিরিট ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। গত বিএনপি সরকারের আমলে নূর মোহাম্মদ তারেক রহমানের ঘনিষ্ট জন হিসেবে জেলায় পরিচিত ছিলেন। বর্তমানে নূর মোহাম্মদ ইউনিসন ফার্মা মানে ইউনানি নামের একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি দিয়েছেন। নূর মোহাম্মদ এখন প্রায় হাজার কোটি টাকা সম্পদের মালিক স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সেটা মনে করছেন।


জেলার কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে জানা যায় যে নুর মোহাম্মদ আশির দশকের বগুড়ায় ছাত্রদল করতেন। বগুড়ার সাতমাথায় ছাত্রদলের মিছিল থেকে প্রকাশ্যে জাসদ ছাত্রলীগের নেতা লাকীকে ১৯৮৭ সালে হত্যা করা হয়।  নুর মোহাম্মদ ছিলেন ওই মামলার আসামি।

জেলা জাসদের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল লতিফ পশারি ওরফে ববি তখন তিনি জাসদ ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। সেসময় ছাত্রদল নেতা নূর মোহাম্মদ লাকী হত্যা মামলার আসামি ছিলেন সেটা তিনি প্রথম আলোকে জানান। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই মামলার আসামিরা রায়ে খালাস পেয়ে যায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায় যে জেলা বিএনপির সাবেক দুই সভাপতি মামলার আসামি ছিলেন । পরবর্তীকালে নূর মোহাম্মদ সহ বাকি সবাই বিএনপি'র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ জন বলে পরিচিতি পেয়ে যায়। আর নূর মোহাম্মদ এই খাতে ব্যবসা বিস্তার করেছেন তারেক রহমান ও হাওয়া ভবনের পরিচয় ব্যবহার করে। বিএনপি সরকারের আমলে তারেক রহমান বগুড়া ফুলবাড়ীতে নূর মোহাম্মদের কারখানা পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন । সেই ঘটনাও 

নূর মোহাম্মদ নানা ভাবে ব্যবহার করতেন।


সর্বশেষ নূর মোহাম্মদকে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শুরুতেই ২২শে জানুয়ারি ২০০৭সালে ৩৬ বোতল আলকোহল সহ গ্রেফতার করে র‍্যাব। সেই সময় নূর মোহাম্মদকে কয়েকদিন হাজতবাস করতে হয়েছিল। এরপরে নূর মোহাম্মদ ছাড়া পেয়ে আর বগুড়ায় থাকেননি । তিনি তখন ঢাকায় থেকে ব্যবসা বিস্তার করেছেন । কিন্তু এখন বর্তমানে প্রায় বেশিরভাগ সময়ই নূর মোহাম্মদ বিদেশে থাকেন বলে জানা গিয়েছে।


সর্বশেষ নুর মোহাম্মদ গত ২০ জানুয়ারি বগুড়া প্রেসক্লাবের জমি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তিনি তার বক্তব্যে বলেন যে তিনি চীনের উদ্যোক্তাদের সাথে যৌথ উদ্যোগে আয়ুর্বেদিক কারখানা দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ৮ বিঘা জমির উপরে এই কারখানা তৈরি করা হবে। এছাড়া তিনি আরও জানান যে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে হোমিও এবং আয়ুর্বেদিক শিল্পে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে।  এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য নূর মোহাম্মদের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে তাকে পাওয়া যায়নি। একটি সূত্র জানিয়েছে যে তিনি এখন দেশের বাইরে আছেন ।

বগুড়ায় মদের ছড়াছড়ি

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন যে বগুড়ার সাতটি সংস্থা হোমিওপ্যাথিক প্রতিকারের জন্য মদ সরবরাহ করার লাইসেন্স পেয়েছে। এর মধ্যে নগরীর ফুলবাড়ী এলাকার পারুল হোমিও গবেষণাগারে প্রতিবছর দুটি লাইসেন্সের আওতায় ৪০০ লিটার সংশোধিত স্পিরিট বিক্রি করার অনুমতি রয়েছে। 


এ ছাড়া খান হোমিও হলের বছরে ৩০ লিটার স্পিরিট ,  দি মুন হোমিও হল বছরে ৫০ লিটার স্পিরিট , বেনুপুর হোমিও চেম্বার বছরে ১১ লিটার স্পিরিট ,  লতিফপুর কলোনির নিরাময় হোমিও ফার্মেসি বছরে ২২ লিটার  স্পিরিট , মাটিডালি এলাকার ফেরদৌস হোমিও হল বছরে ১০ লিটার, করতোয়া হোমিও হল বছরে ২৯ লিটার স্পিরিট বিক্রির অনুমোদন রয়েছে।


তবে দেখা গেছে, বগুড়া শহরের পাইকারি দোকান সহ অর্ধ শতাধিক হোমিওপ্যাথিক দোকান থেকে প্রতি মাসে কমপক্ষে ২০ হাজার লিটার স্পিরিট বিক্রি হচ্ছে। এর অর্ধেক বিক্রি হচ্ছে এই তিন ভাইয়ের মালিকানায় পারুল হোমিও ল্যাবরেটরি এবং পুনম হোমিও ল্যাবরেটরি থেকে। এ ছাড়া তিনমাথা এলাকার খান হোমো হলের শাহিনুর রহমান ভেজাল মদ বিক্রি করার অন্যতম হোতা। তিনিও এখন আত্মগোপনে রয়েছেন।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বগুড়ায় ভেজাল মদ কারখানা খোলেন হোমিওপ্যাথির ব্যবসায়ের আড়ালে । তারা ভেজাল মদ তৈরি করছে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ তৈরির আড়ালে । ভেজাল অ্যালকোহলের ব্যবসায় শুরু করেছে হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যালকোহল সরবরাহের লাইসেন্স সহ । আইন প্রয়োগকারী অভিযানগুলি হোমিওপ্যাথির আড়ালে বড় আকারের অ্যালকোহল মজুত করার প্রমাণও পেয়েছে। বৃহস্পতিবার নাটাইপাড়া এলাকার দেড় হাজার লিটার মদ জব্দ করা হয়েছে একটি বাড়িতে করতোয়া হোময়েও ল্যাবরেটরির একটি কারখানা থেকে ।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন যে করতোয়া হোমো ল্যাবরেটরি সর্বশেষ গত ১৫ ই অক্টোবর ২৯ লিটার স্পিরিট বের করেছিল। এত বিপুল পরিমাণে স্পিরিট কীভাবে তাদের কাছে এসেছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে পুলিশ হেফাজতে থাকা করতোয়া হোময়েওর মালিক সাহেদুল আলম দাবি করেছেন যে তিনি আইনানুগভাবে তার স্টকে স্পিরিট আমদানি করেছিলেন।


বগুড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেছিলেন যে হোমিওপ্যাথিক চিকিত্সার জন্য সংশোধিত স্পিরিট বা ইথানল অ্যালকোহল সরবরাহের নামে হোমিওপ্যাথিক ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় এটিকে স্বল্প দামের মিথেনল বা ভিনেচার  স্পিরিট ভেজাল দিয়ে অ্যালকোহল হিসাবে বিক্রি করছেন। এই পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে কারখানা পর্যায়ে প্রতি ইথানল অ্যালকোহল এর দাম পড়ে ৪৫০ টাকা। যেখানে মিথানল এর দাম মাত্র ১২০ টাকা কেজি প্রতি। এজন্য ওই কারখানার মালিকেরা বেশি লাভের আশায় মিথানল মিশিয়ে ইথানল বিক্রি করছে।